অধ্যায়ভিত্তিক সারাংশ
অধ্যায় ০১: যৌন জীবনের পটভূমিকা
মানুষই একমাত্র প্রাণী যার যৌন আকাঙ্ক্ষা সীমিত ঋতুর মধ্যে আবদ্ধ নয়। এই কারণেই মানুষের মধ্যে পরিবার গঠনের প্রবণতা স্বাভাবিক। শিশুর দীর্ঘ লালন-পালনের প্রয়োজনীয়তা এবং নারীর নিরাপত্তার প্রয়োজন থেকে বিবাহ প্রথার উদ্ভব হয়েছে — পরিবার থেকেই বিবাহ, বিবাহ থেকে পরিবার নয়। ভারতে পিতৃকেন্দ্রিক ও মাতৃকেন্দ্রিক এই দুই ধরনের পরিবার প্রচলিত। যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবার ভারতের বৈশিষ্ট্য। হিন্দুসমাজে অন্তর্বিবাহ ও বহির্বিবাহের নিয়ম, গোত্র-টোটেম ব্যবস্থা, এবং লিঙ্গ অনুপাতের হ্রাস বিবাহ সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে।
অধ্যায় ০২: প্রাচীন ভারতে বিবাহ
বৈদিক যুগে বিবাহ গ্রামভিত্তিক বহির্বিবাহের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং একটি বধূর উপর সকল সহোদর ভ্রাতার যৌনাধিকার ছিল (ভ্রাতৃত্বমূলক বহুপতিত্ব)। মহাভারতীয় যুগে আট রকম বিবাহ — ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ — প্রচলিত ছিল। এই যুগে বহুপত্নী ও বহুপতি গ্রহণ উভয়ই ছিল। বিবাহপূর্ব ও বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্ক সমাজস্বীকৃত ছিল। রামায়ণের যুগে স্বয়ম্বর প্রথায় বিবাহ রাজপরিবারে প্রচলিত ছিল। ধীরে ধীরে মন্ত্র-যজ্ঞ-সপ্তপদীগমনের মাধ্যমে ব্রাহ্ম বিবাহ প্রাধান্য পায়।
অধ্যায় ০৩: যৌনাচারের উপর স্মৃতিশাস্ত্রের প্রভাব
স্মৃতিশাস্ত্রের যুগে (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে খ্রিস্টাব্দ পঞ্চম শতক) মনুসংহিতার নির্দেশনায় বিবাহ সংস্কারিত হয়। বিবাহ বাধ্যতামূলক করা হয়, কন্যার বিবাহ রজস্বলা হওয়ার আগেই দেওয়ার বিধান রইল। সগোত্র ও সপিণ্ডে বিবাহ নিষিদ্ধ হলো। “নিয়োগ” প্রথা (অপর পুরুষের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন) প্রথমে অনুমোদিত ও পরে নিষিদ্ধ হলো। সতীত্বের নতুন সংজ্ঞা গড়ে উঠল — পতিব্রতাই সতী। ব্যভিচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বিধান করা হলো। মনু প্রণীত আদর্শে বিবাহ হলো মন্ত্র-যজ্ঞ-সপ্তপদী, সর্বজনীন, সবর্ণে, গোত্র-প্রবর-সপিণ্ড মেনে।
অধ্যায় ০৪: জ্ঞাতিত্ব ও স্বজন বিবাহ
ভারতে জ্ঞাতিত্ব পিতৃকুল ও মাতৃকুল — দুদিক থেকেই নির্ধারিত হয়। উত্তর ভারতে সপিণ্ড বিধি কঠোরভাবে পালিত হয়, দক্ষিণ ভারতে শিথিল। দক্ষিণ ভারতে মামাতো বোন ও পিসতুতো বোন বাঞ্ছনীয় পাত্রী। দেবরণ (বিধবা ভ্রাতৃজায়াকে বিবাহ) ও শালীবরণ প্রাচীনকালে ব্যাপক ছিল, বর্তমানে নিম্নশ্রেণিতে সীমাবদ্ধ। বহুপতিক বিবাহ টোডা ও খস জাতির মধ্যে এখনও প্রচলিত। আসামের কিছু উপজাতিতে বিধবা শ্বাশুড়ি ও বিমাতাকে বিবাহের বিচিত্র রীতি আছে।
অধ্যায় ০৫: হিন্দুসমাজে বিবাহ
হিন্দুর বিবাহ জন্মসূত্রে নির্ধারিত জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। প্রতিটি জাতি আবার অন্তর্বিবাহের শাখা-উপশাখায় বিভক্ত। যোটকবিচারসহ জ্যোতিষ, বরপণ-কন্যাপণ, ঘটকের ভূমিকা বিবাহকে জটিল করে। বাল্যবিবাহ ব্যাপক ছিল, এখন হ্রাস পেয়েছে। বিধবাবিবাহ উচ্চবর্ণে নিষিদ্ধ থাকলেও নিম্নশ্রেণিতে প্রচলিত। উচ্চবর্ণে বিবাহবিচ্ছেদ ছিল না, নিম্নশ্রেণিতে ও দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত ছিল। নায়ার সমাজের “সম্বন্ধম” প্রথা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গাছ বা জড়বস্তুর সঙ্গে বিকল্প বিবাহের অদ্ভুত রীতিও বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।
অধ্যায় ০৬: আদিবাসীর সমাজ সংগঠন ও বিবাহ
আদিবাসী সমাজ উপজাতি বা ট্রাইবভিত্তিক, যেখানে টোটেম বা গ্রামভিত্তিক বহির্বিবাহ প্রচলিত। কন্যা-বিনিময়, কন্যাপণ ও শ্রমদানে বিবাহ — এই তিন পদ্ধতিই আদিবাসীতে প্রচলিত। রাক্ষস বিবাহের ছায়া “ঘিসকরলেজানা” ও “সিন্দুর ঘষা”-তে এখনও দেখা যায়। পিসতুতো-মামাতো বিবাহ অনেক দক্ষিণী উপজাতিতে বাঞ্ছনীয়। টোডাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বমূলক বহুপতিক বিবাহ প্রচলিত। বাল্যবিবাহ আদিবাসীতে নেই, বিধবাবিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সহজ।
অধ্যায় ০৭: বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান
বিবাহ অনুষ্ঠান দুই ভাগে বিভক্ত — স্ত্রী-আচার ও পুরোহিতীয় ধর্মীয় আচার। বিভিন্ন প্রদেশে অনুষ্ঠানের ভিন্নতা লক্ষণীয়: বাংলায় সিন্দুরদান, তামিলনাড়ুতে তালিবন্ধন (থিরুমঙ্গলম), মহারাষ্ট্রে মঙ্গলসূত্র ও মঙ্গলাষ্টক, গুজরাটে ফেরা ও চুনরি প্রসঙ্গ, হরিয়ানায় চৌকা অনুষ্ঠান। আদিবাসীদের অনুষ্ঠান অনেক সরল — নাচগান, মদ্যপান, দণ্ড প্রদক্ষিণ বা তালিবন্ধনের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
অধ্যায় ০৮: বিবাহ-পূর্ব যৌন সংসর্গ
হিন্দুসমাজে বিবাহের আগে যৌনসম্পর্ক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আদিবাসী সমাজে অনেক উপজাতিতে ছেলেমেয়েদের “ঘুমঘর” বা ঘোটুল প্রচলিত। মুরিয়াদের ঘোটুল সবচেয়ে পূর্ণবিকশিত — এখানে ছেলেমেয়েরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে যৌনজীবনের প্রশিক্ষণ পায়, তবে অজাচার ও ব্যভিচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল বাপ-মায়ের যৌনজীবন শিশুদের থেকে আড়াল করা এবং ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনের প্রস্তুতি।
অধ্যায় ০৯: বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সংসর্গ
যৌন আতিথেয়তা প্রাচীন ভারতে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল (মহাভারতে সুদর্শন ও ওঘাবতীর কাহিনী)। তন্ত্রশাস্ত্রে চক্রপূজায় পরস্ত্রীর সঙ্গে মিলন বিহিত। কিছু আদিবাসী সমাজে স্ত্রীকে বন্ধক রাখার প্রথাও ছিল। ব্যভিচারকে স্মৃতিশাস্ত্র ও আদিবাসী সমাজ উভয়েই কঠোরভাবে দণ্ডনীয় মনে করে। গুরুতল্প (গুরু-পত্নীর সঙ্গে সম্পর্ক) সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
অধ্যায় ১০: হিন্দুসমাজে গণিকার স্থান
প্রাচীন ভারতে গণিকারা সামাজিক মর্যাদা ভোগ করত — উৎসবে, যুদ্ধে, রাজসভায় তাদের সম্মানজনক ভূমিকা ছিল। স্মৃতিকাররা তাদের নিন্দা করলেও তন্ত্রশাস্ত্র তাদের দেবীর স্থান দিয়েছে। দেবদাসী প্রথা মন্দিরে গণিকাবৃত্তির ধর্মীয় রূপ। বাৎসায়নের কামসূত্রে গণিকার আচরণবিধি বিস্তারিত বর্ণিত। বর্তমানে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে গণিকাবৃত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যকলাপ দণ্ডনীয়।
অধ্যায় ১১: মুসলিমসমাজে বিবাহ
মুসলিম বিবাহে হিন্দুর মতো গোত্র বা সপিণ্ড বিধির বাধা নেই। বাঞ্ছনীয় বিবাহ হিসেবে খুড়তুতো-মামাতো ভাইবোনের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত। বর ও কনে উভয়ের সম্মতি বাধ্যতামূলক। চারটি পর্যন্ত বিবাহ ইসলামে বৈধ। বিবাহবিচ্ছেদ হিন্দুর তুলনায় অনেক সহজ। মুসলিম পুরুষ কিতাবিয়া নারীকে বিবাহ করতে পারলেও মুসলিম নারী অমুসলিমকে বিবাহ করতে পারে না।
সম্পূর্ণ বইয়ের সারাংশ
অতুল সুরের “ভারতের বিবাহের ইতিহাস” (১৯৬০) হলো ভারতীয় বিবাহ প্রথার একটি তুলনামূলক নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা।
বইটির মূল বক্তব্য হলো যে ভারতে বিবাহ কোনো একক, স্থির প্রতিষ্ঠান নয় — এটি দেশ, কাল, জাতি ও সম্প্রদায়ভেদে বহুরূপী। লেখক দেখান যে বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিবাহের ধারণা ধাপে ধাপে রূপান্তরিত হয়েছে।
বইয়ের কেন্দ্রীয় চারটি প্রশ্ন হলো —
প্রথমত, কেন বিবাহ হয়? লেখকের উত্তর: জীবজনিত কারণে পরিবার গঠনের প্রয়োজনীয়তা, এবং সামাজিক শৃঙ্খলার প্রয়োজনে যৌন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ।
দ্বিতীয়ত, কার সঙ্গে বিবাহ হয়? বিভিন্ন সমাজে অন্তর্বিবাহ ও বহির্বিবাহের জটিল নিয়মাবলী — গোত্র, সপিণ্ড, টোটেম, কৌলীন্য — বিবাহযোগ্য পাত্রপাত্রীকে নির্ধারণ করে। উত্তর ভারতে নিষেধের গণ্ডি বড়, দক্ষিণ ভারতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যেই বিবাহ বাঞ্ছনীয়।
তৃতীয়ত, কীভাবে বিবাহ হয়? প্রাচীনে গান্ধর্ব থেকে রাক্ষস — নানা পদ্ধতি ছিল। পরে মন্ত্র-যজ্ঞ-সপ্তপদী মানক হলো হিন্দুর জন্য। আদিবাসীতে সরল অনুষ্ঠান। মুসলিমে চুক্তির মাধ্যমে।
চতুর্থত, বিবাহের বাইরে যৌনতার কী স্থান? প্রাচীনে যৌন আতিথেয়তা ও নিয়োগ প্রথা সমাজস্বীকৃত ছিল। স্মৃতির যুগে পতিব্রতার আদর্শ প্রবর্তিত হলো, ব্যভিচার কঠোরভাবে দণ্ডনীয় হলো। আদিবাসী ঘোটুলে বিবাহপূর্ব যৌনচর্চার নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল।
সামগ্রিকভাবে লেখক প্রমাণ করেন যে ভারতের বিচিত্র বিবাহ প্রথার মূলে রয়েছে এই দেশের নানা জাতি ও নরগোষ্ঠীর মিশ্রণ — আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রালয়েড ও মঙ্গোলীয়। প্রতিটি সমাজ তার নিজস্ব অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজন অনুযায়ী বিবাহ প্রথাকে রূপ দিয়েছে। আধুনিক আইন (হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৬, বাল্যবিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯২৯) এই বৈচিত্র্যময় ব্যবস্থাকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করেছে।
