• গল্প
  • রহস্য গল্প
  • অচেনা শুভাকাঙ্ক্ষী

    এক

    রাত ১০:৪৫। ধানমণ্ডির ৭নং রােডের ব্রিজের পাশে পাঁচ তলা এক ফ্ল্যাট বাড়ির তৃতীয় তলা। ফ্ল্যাটটার সাজানাে ড্রইং রুম দেখে যে কেউই বুঝতে পারবে এর মালিক খুবই রুচিবান একজন মানুষ।

         ড্রইং রুমের এক কোনায় একটা সিঙ্গেল সােফায় গা এলিয়ে একজন লােক বসে আছে। লােকটার বয়স সাতাশ-আটাশ। উচ্চতা ছয় ফুট এক ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা। দেখতে খুবই সুদর্শন। ও-ই এই ফ্ল্যাটের মালিক। নাম জাহিদ আহমেদ। নামকরা এক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠিত একজন লােকের যা যা থাকার দরকার তার সবই আছে ওর । ও বিবাহিত। প্রেমের বিয়ে। স্ত্রীর নাম শারমিন আহমেদ। রূপ আর গুণের আধার যেন শারমিন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে পড়ার সময় ওদের পরিচয় হয়। প্রথম দিকে ওদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও দিনে দিনে তা গভীর প্রেমে রূপ নেয়। এরপর অনার্স পাশ করার পর জাহিদ চাকরি পায়। তারপরই ওদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওদের ভালবাসায় কখনও ঘাটতি হয়নি। আসলে জাহিদের প্রতি শারমিনের অত্যধিক ভালবাসাই এই ঘাটতি হতে দেয়নি।

         কিন্তু সােফায় জাহিদ খুবই মন খারাপ করে বসে আছে। কারণ, আজ দশ-বারাে দিন হবে ঠিক রাত এগারােটায় অচেনা এক লােক জাহিদের কাছে ফোন করে। পরিচয় জানতে চাইলে নিজেকে সে জাহিদের শুভাকাঙ্ক্ষী বলে পরিচয় দেয়। আজও রাত ঠিক এগারােটায় ফোন এল। জাহিদ মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল ফোন যতবারই বাজুক ধরবে না ও। কিন্তু ফোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে ও এমনভাবে ওটার দিকে এগিয়ে গেল যেন কোনও শক্তিশালী চুম্বক লােহাকে টানছে।

    ফোনের রিসিভার তুলে হ্যালাে বলতেই অপর প্রান্ত থেকে বলল, “কে, জাহিদ সাহেব?

         ‘হ্যা,’ জাহিদ বলল। কী চান?

         ‘আমি আপনার স্ত্রী শারমিন সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।’

         ‘দেখুন, জাহিদ রাগত কণ্ঠে বলল, প্রতিদিন আপনি এই সময় ফোন করে আমার স্ত্রী সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চান কিন্তু বলেন না । আসলে আপনি কী চান?

    ‘আরে, রাগ করছেন কেন? অপর প্রান্ত থেকে বলল। আপনাকে অনেক কথাই আমার বলার আছে। তার আগে বলুন তাে কালকে কি আপনি অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছেন?’

        ‘হা, জাহিদ জবাব দিল। তাতে কী?

         ‘গতকালই আপনার স্ত্রীর প্রেমিক আপনাদের বাসায় গিয়েছিল।’

         ‘আপনি কী বলছেন একবার ভেবে দেখেছেন?’ জাহিদ ঘৃণা মেশানাে কণ্ঠে বলল। ‘কে আপনি?

         ‘আগেই বলেছি আমি আপনার একজন শুভাকাক্ষী।’

         ‘আপনি যখন আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আর আমার স্ত্রীর প্রেমিককে দেখেছেন, তা হলে নিশ্চয়ই আমার স্ত্রীর প্রেমিকের পরিচয় জানেন। দয়া করে তার নামটা জানাবেন?

         ‘দুঃখিত, নামটা জানাতে পারছি না। তবে আপনার স্ত্রীর সাথে তার প্রেমিকের প্রেমলীলা, প্রায় প্রতিদিনই আমার ফ্ল্যাট থেকে দেখতে পাই। একটু সাবধান হলে আপনিও তাকে দেখতে পাবেন। সাধারণত যেদিন অফিস থেকে আপনার ফিরতে দেরি হয় সেদিনই সে যায়। আর আপনি বাড়ি ফেরার আগে চলে যায়।’

         ব্যস, এটুকু কথা বলে অচেনা লােকটা ফোন রেখে দিল। জাহিদের মাথায় নানা ধরনের চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। যতই ও চিন্তা করতে লাগল ততই ওর মাথা গরম হয়ে উঠল। কিন্তু প্রেমের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোনও ঘটনার কথা ওর মনে পড়ল না। যাতে স্ত্রী শারমিনকে সন্দেহ করতে পারে।

         প্রায় প্রতি বৃহস্পতি আর শনিবার জাহিদকে অফিসে অনেক কাজ করতে হয়। তাই বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় । আর তাই শারমিনকে ফোন করে জানিয়ে দেয়।

         জাহিদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সামনের শনিবারে যেভাবেই হােক অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরুবে। কিন্তু শারমিনকে ফোন করে বলবে আসতে দেরি হবে।

         শনিবারে নিজের পরিকল্পনা মতই কাজ করল জাহিদ। শারমিনকে ফোন করে বলল ফিরতে দেরি হবে। কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় অফিস থেকে বেরিয়ে ওর ফ্ল্যাট বাড়ির সামনের দিকে লেকের পাশে অন্ধকার এক কোণে গাড়ি পার্ক করে তার ভেতর থেকে তিন তলায় নিজের ফ্ল্যাটের ওপর নজর রাখতে লাগল।

         প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেও যখন দেখল কেউ ঢুকছে না অথবা বের হচ্ছে না তখন অপরের কথা অনুযায়ী নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করার জন্য অনুশােচনায় পুড়তে লাগল। মনে মনে নিজেকে বার বার তিরস্কার করল।

         তারপর দ্রুত নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখল শারমিন সােফায় গা এলিয়ে দিয়ে টি.ভি. দেখছে। টিভিতে স্টার প্লাস চ্যানেলে চলছে নাটক ‘কিউকি সাস বি কাভি বহু থি’। নাটকটা শারমিনের খুবই প্রিয়।

         জাহিদকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে শারমিন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, এত তাড়াতাড়ি এসেছ শরীর খারাপ করেনি তাে?’

         না, কিছুই হয়নি, জাহিদ দ্রুত বলল। কাজ শেষ হয়ে গেছে তাই ফিরে এলাম।

         শারমিন জাহিদের কপালে হাত রেখে বলল, নাহ, জ্বর নেই। ঠিক আছে, তুমি ফ্রেশ হয়ে এসাে টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’

         খাওয়া শেষ হতে রাত পৌনে এগারােটা, বেজে গেল। ঠিক সেই সময়ই ফোন বেজে উঠল।

    জাহিদ ফোন ধরার আগেই শারমিন ফোনের রিসিভার উঠাল। কিন্তু বার বার হ্যালাে বলার পরও অপর প্রান্ত থেকে কোনও সাড়া পেল না। ফলে রিসিভার ক্রেডলে রেখে দিল। তারপর বিছানায় জাহিদের পাশে বসে বলল, ‘জাননা, প্রায় রােজই এরকম সময়ে ফোন বেজে ওঠে। আর আমি রিসিভ করলেই কেউ কথা বলে না।

         মনে হয় কেউ দুষ্টুমি করে কল করে, জাহিদ বলল। এরপর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।

         কিন্তু জাহিদের চোখে ঘুম আসল না । বারবার বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। রাত প্রায় একটার দিকে আবার ফোন বেজে উঠল ।

         জাহিদ রিসিভার তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে সেই অপরিচিত লােকটার পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসল।

    ‘আজ আপনি এক ঘন্টা আগে এসেছেন, অচেনা লােকটা বলল।’

         হ্যা। তাতে আপনার কী? এত রাতে ফোন করেছেন কেন? আপনি মানুষ না জানােয়ার?

         অপর প্রান্তে থাকা লােকটা কিন্তু একটুও রাগল না। বরং সে শান্ত কণ্ঠে বলল, আজ আপনি আপনার স্ত্রীর প্রেমিককে ধরার জন্য লেকের পাশে গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু আপনার দুর্ভাগ্য যে আপনি সফল হননি। তবে এমন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে অবশ্যই সফল হবেন। আর তখনই আপনার এই শুভাকাক্ষীর প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন।’

         কথাগুলাে শুনে জাহিদ একটু সুস্থির হলাে। ও বলল, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি আমাকে খুব ভাল করে চেনেন। এখন দয়া করে আপনার পরিচয়টা দেবেন?

         অচেনা লােকটা বলল, সময় হােক তখন দেব। গুড় নাইট। তারপর অপর প্রান্তে ফোন রেখে দিল।      

         রিসিভার রেখে দিয়ে জাহিদ শােবার ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। রাতের ঠাণ্ডা বাতাস ওর মাথা ঠাণ্ডা করতে পারছে না। ওর মনে নানা ধরনের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। বারান্দা থেকে এসে বিছানায় শুয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে লােক ফোন করে ওকে নানা ” কথা বলছে তাকে সামনে পেলে উচিত শাস্তি দেবে।

    দুই

    বৃহস্পতিবার।

    আজও জাহিদের হাতে প্রচুর কাজ আছে। কিন্তু কোনও কাজে মন বসাতে পারছে না। আর তাই গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। গত শনিবারের মত লেকের পাড়ে ঠিক একই জায়গায় গাড়ি থামিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে নজর রাখতে শুরু করল।

         জাহিদ মনে মনে ঠিক করল, আজ এ ব্যাপারটার শেষ দেখেই ছাড়বে। আজকে যদি সন্দেহজনক কোনও কিছু দেখতে না পায় তবে আর কখনও ফোন ধরবে না, আর মনের মাঝে এ চিন্তাকে স্থান দেবে না।

         ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর ওর ফ্ল্যাটের শােবার ঘরের বারান্দায় একটা পুরুষের ছায়া দেখতে পেল। সাথে সাথে ওর মনে সন্দেহের দানা ঘনীভূত হতে থাকল।

         ছায়ামূর্তিটি ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে সরে বাইরে বেরিয়ে এল। আর এটা দেখে জাহিদ ওর প্যান্টের পকেটে রাখা লাইসেন্স করা পিস্তলের বাটে হাত রাখল।

         অচেনা কণ্ঠস্বরের মালিক যে সত্যিই ওর – শুভাকাক্ষী এ ব্যাপারে ওর ধারণা দৃঢ় হলাে।

    তা হলে এই লােকটাই ওর অবর্তমানে ওর ফ্ল্যাটে আসে। আজই এই লম্পটের শেষ দিন।

         ছায়ামূর্তিটা বাড়ির বাইরে পা রাখলে রাস্তার ল্যাম্পপােস্টের আলােতে তার চেহারা দেখে জাহিদ চমকে উঠল। আরে এ তাে ওর ছেলে বেলার বন্ধু রাশেদ!

         ওহ আল্লাহ! তা হলে এই ব্যাপার। ছােটবেলার বন্ধুই ওর সর্বনাশ করল! রাশেদ এত বড় বিশ্বাসঘাতক? একই সাথে ও আমার আর নিজের স্ত্রীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আজ ওর নিস্তার নেই। রাশেদকে দেখে এ কথাগুলােই জাহিদ ভাবল।

    তিন

    এদিকে জাহিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে রাশেদ আপন মনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ কে যেন ওর নাম ধরে ডাকল। রাশেদ থেমে রাস্তার এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। আবার চলতে শুরু করল।

         দ্বিতীয়বার কে যেন আবারও রাশেদের নাম ধরে ডাকল। রাশেদ ওই ডাকের শব্দ লক্ষ্য করে একটু সামনে গিয়ে জাহিদের গাড়িটা দেখতে পেল। গাড়ির ভেতরে জাহিদকে বসা দেখে অবাক হয়ে গেল। ‘আরে, জাহিদ, তুই?’ রাশেদ অবাক কণ্ঠে বলল। বাসার সামনে গাড়িতে বসে কী করছিস?

         ‘তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠ, রাশেদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জাহিদ বলল। “তাের সাথে আমার জরুরী কথা আছে।’

    ‘জরুরী কথা থাকলে চল তাের বাসায় যাই,’ রাশেদ অবাক হয়ে বলল।

    ‘না, বাসায় এ কথা বলা যাবে না, জাহিদ বলল। তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠ।’

         ‘কিন্তু এত রাতে কোথায় যাব?’ রাশেদ জিজ্ঞাসা করল। ‘বেশি কথা বলবি না। আমি যা বলছি তা না শুনলে তাের কপালে খারাবি আছে।’ এ কথা বলে জাহিদ পকেট থেকে পিস্তল বের করে রাশেদের বুক বরাবর তাক করল।

         পিস্তল দেখে রাশেদ বাধ্য ছেলের মত গাড়িতে উঠে বসল।

         রাশেদকে প্যাসেঞ্জার সিটে বসতে দেখে জাহিদ পিস্তল নাচিয়ে বলল, “উহু, প্যাসেঞ্জার সিটে নয়, ড্রাইভিং সিটে বস।’

         ড্রাইভিং সিটে বসে রাশেদ বলল, এখন বল, কোথায় যাব? ‘পোস্তগােলার দিকে যেতে থাক, বুড়িগঙ্গা সেতু পেরিয়ে নদীর ওপারে বসুন্ধরা রিভার ভিউ প্রকল্পের কাছে যাবি।’

         রাশেদ টু শব্দ না করে গাড়ি চালাতে থাকল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল জাহিদ স্থির হাতে ওর দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছে। জাহিদ এমনটা কেন করছে এবং ওর কী দোষ, তার কিছুই রাশেদ বুঝতে পারছে না।

         অবশেষে ওদের গাড়ি বুড়িগঙ্গা সেতু পেরিয়ে বসুন্ধরা রিভার ভিউ প্রকল্পে প্রবেশ করল। জাহিদ বলল, “আরও ভেতরে চল। রাশেদ কোন কথা না বলে গাড়ি চালাল।

         প্রকল্পের আরও ভিতরে নির্জন অরণ্যে প্রবেশ করল। রাশেদ ভীত কণ্ঠে জাহিদকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কত ভেতরে যাব?

         ‘আর যেতে হবে না। এবার গাড়িটা পার্ক করে নেমে যা।’

         এখানে নেমে যাব কোথায়? রাশেদ জিজ্ঞাসা করল। তুই আমার সাথে এমন করছিস কেন?’

         ‘কোনও প্রশ্ন করবি না। যা বলছি তাই কর।’

         জাহিদের পিস্তল ধরা হাতের ইশারায় রাশেদ গাড়ি থেকে নামল। তারপর দুজনে একটা বট গাছের নীচে এসে দাঁড়াল।

    ‘জাহিদ, আমার সাথে এমন করছিস কেন? রাশেদ কাতর কণ্ঠে বলল, আমি না তাের ছােট বেলার বন্ধু?

         ‘আমি তােকে তাের পাপের শাস্তি দিতে চাই,’ জাহিদ বলল।

         ‘আমার পাপের শাস্তি?’ রাশেদ বলল। ‘কেন, আমি তাের কী ক্ষতি করেছি? ..

         ‘সেটা নিজের মনকে জিজ্ঞাসা কর, জাহিদ বলল। তুই আর বেশি সময় পাবি না।

         ‘সময় পাব না কেন? রাশেদ জিজ্ঞাসা করল। আমাকে কি খুন করবি?’

         হ্যা,’ জাহিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল। সাথে সাথে রাশেদের বুকে দু’বার গুলি করল । গুলি করার আগে রাশেদ চিৎকার করে উঠল। কিন্তু গুলির শব্দে ওর চিৎকার চাপা পড়ে গেল।

    চার

    রাশেদের লাশটাকে পানিতে ফেলে দিয়ে জাহিদ ওর বাসায় ফিরে এল। ওর মনে এখন অনেক শান্তি।

    ফ্ল্যাটের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল ড্রইং রুমের সােফায় বসে ওর বউ আর রাশেদের স্ত্রী রুনা কথা বলছে।

         দরজা খােলার শব্দে, জাহিদকে না দেখে রাশেদের স্ত্রী রুনা বলল, একটা আইসক্রিম আনতে এত দেরি হলাে? এতক্ষণ কোথায় ছিলে?’

         একথা শুনে অবাক হয়ে জাহিদ ওদের সামনে আসলে শারমিন বলল, “ওহ্, তুমি । রুনা ভেবেছে, রাশেদ ভাই বুঝি ফিরে এসেছে।’

         ‘বুঝলাম না,’ জাহিদ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করল।

         ‘বিকেলের দিকে রাশেদ ভাই আর রুনা ভাবি বাসায় এসেছেন,’ শারমিন বলল । ‘তােমার জন্যই সবাই অপেক্ষা করছিলাম। আমরা আইসক্রিম খাব, একথা রাশেদ ভাইকে বলতে উনি তা আনার জন্য সেই যে গেলেন আর এখন পর্যন্ত ফিরে আসার নাম নেই।’

         শারমিনের কথা শুনে জাহিদের মাথা ঘুরতে থাকে। ওর বুকে কাঁপন ধরে যায় । এ কী করেছে ও, অচেনা এক লােকের কথা

         শুনে প্রাণের বন্ধুকে খুন করেছে।

    জাহিদকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুনা উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ভাই, একটু দেখুন না ও কোথায় গেল? খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে ।

         জাহিদের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছে। নিজেই যে রাশেদকে গুলি করে খুন করেছে, একথা কীভাবে রুনাকে বলবে? অতএব ও যে একজন খুনি এটা যাতে কোনভাবে প্রকাশ না পায় সেজন্য কিছু সময় বাইরে ঘুরে ফিরে আসল।

         জাহিদ বাইরে থেকে ফিরে এসে বলল। যে, ধারে কাছে কোথাও রাশেদকে দেখেনি। একথা শুনে স্বামীর বিপদের আশংকায় রুনা কান্নায় ভেঙে পড়ল।

         রাশেদ যে সব জায়গায় যেতে পারে সে সব জায়গায় ফোন করা হলাে। বিভিন্ন হাসপাতালে খোজ নেয়া হলাে। কিন্তু কোথাও রাশেদের খোজ পাওয়া গেল না। আর খোজ পাওয়া যাবেই বা কী করে, জাহিদ কিছুতেই রাশেদের মৃত্যু সংবাদ রুনাকে বলতে পারল না। তা হলে যে ও খুনি হিসেবে ধরা পড়ে যাবে।

         রুনাকে সান্ত্বনা দিতে শারমিন তাকে ওর নিজের বেডরুমে নিয়ে গেল।

         জাহিদ সােফায় বসে সেই ভুতুড়ে ফোনের অপেক্ষা করতে থাকে।

         ‘সারারাত অপেক্ষা করার পরও জাহিদের সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন আসল না। আর আসবেই বা কী করে? যে লােক ফোন করত, তাকেই তাে জাহিদ সেই বট বাছের নীচে চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে। জাহিদ একথা বুঝতে পারল না, নাকি পেরেছে?।

    [বিদেশি গল্প অবলম্বনে]

    – তারক রায়

    Spread the love

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    2 mins