তন্ত্র,-মন্ত্রের দিকে প্রবল ঝোক পিতার দিক থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল ফকির । পিতা সারাটি জীবন বহু ঘাত-প্রতিঘাত নীরবে সহ্য করে সাধনা করে কী ফল পেয়েছিলেন তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে আমরা কখনও দেখতে পাইনি। তবে তা যে পূর্ণ ছিল না তার প্রমাণ হচ্ছে ফকিরের নাম করণে। পিতার অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ছেলের নাম রেখেছিলেন ফকির। যার প্রকৃত অর্থ মিসকিন নয়, বরং সাধক। আর সাধনার চরম লক্ষ্য হচ্ছে সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলা।
বাজারে দাঁড়িয়ে যাদুকরের কেরামতি দেখছিলাম আমরা। জ্যান্ত মানুষকে কাপড়ের নীচে ঢুকিয়ে ছুরি দিয়ে ফালাফালা করছিল সে। মানুষ কাটা যাদুকর নিজেকে সাধক দাবি করে বলছিল অমাবস্যার রাতে ন্যাংটো হয়ে কবর থেকে মরার খুলি তুলে আনতে পারলে অসীম ক্ষমতাধর হওয়া যায়। এমন লােকের অঙ্গুলী হেলনে নাকি সবাই ওঠাবসা করতে থাকবে। বারাে বছরের সাধনার দ্বারা যে পর্যায়ে পৌছা যায়, তা মাত্র একটি অমাবস্যার রাতেই যে কোনও মানুষের দ্বারা সম্ভব।
বাজারের সাধকের কথাগুলাে দ্বারা ফকির কতটা প্রভাবিত হয়েছিল তা আমরা প্রথমে অনুভব করতে পারিনি। সে শুধু আমাদেরকে জানিয়েছিল কাজটা করা দরকার। আমরা এ ধরনের একটা উদ্ভট কাজ করার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ বােধ করছিলাম না। আসলে কাজটা করার মত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি আমরা। যাদুকর জানিয়েছিল এধরনের ক্ষমতা অর্জনের জন্য দ্বিতীয় কারও সাহায্য নেয়া যাবে না। একাই সব কিছু করতে হবে।
তা ছাড়া এমন কাজ করতে গেলে নাকি জিনেরা বিভিন্ন রূপ ধরে এসে বাধা দেয়ারও চেষ্টা করবে। অমাবস্যার রাতে একা-একা উদোম শরীরে কবরে গিয়ে সেধে জিন-ভূতের খপ্পরে পড়ার দুঃসাহস ছিল না আমাদের। কাজেই অসীম ক্ষমতাবান হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সে ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেয়ার কথা মনেও হয়নি আমাদের। কিন্তু ফকিরের ব্যাপারটা ভিন্ন। পিতার স্বপ্ন পূরণে যে কোনও পন্থা অবলম্বনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল সে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়ে অমাবস্যার রাতে ন্যাংটো হয়ে কবর থেকে মড়ার খুলি তুলে নিয়ে এল সে। আমরা গভীর আগ্রহে তার মধ্যে অসীম ক্ষমতার প্রকাশ দেখার অপেক্ষা করতে লাগলাম । কয়েকটা দিন সে-ও কেমন যেন গম্ভীর হয়ে চলতে লাগল। কথা-বার্তা কমিয়ে দিয়ে অধিকাংশ সময় নীরবতা অবলম্বন করতে লাগল সে। আমরা মনে করলাম অসীম ক্ষমতা প্রকাশের পূর্ব মুহূর্তে তার এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। আমরা একই সঙ্গে তাকে কিছুটা ভক্তি করতে লাগলাম। আবার উল্টো-পাল্টা কিছু হয়ে গেল নাকি ভেবে ভয়ও হতে লাগল। কিন্তু সত্যিই আমরা গভীর প্রতিক্ষায় ছিলাম, কখন সে আমাদের সামনে তার অসীম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটাতে থাকবে। এমনিভাবে অনেক দিন পার হয়ে গেল, সপ্তাহ পার হয়ে মাস এল। ফকিরের অর্জিত ক্ষমতার কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না আমরা। অবশেষে অধৈর্য হয়ে স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলতে লাগলাম তার দুঃসাহসিক সেই অভিযানের কথা।
হঠাৎ একদিন আমাদের আড্ডায় চিৎকার করে উঠল সে, সব ভুয়া।
‘ভুয়া!’ আমরা বিস্ময়ে বিমূঢ়।
‘হ, ভুয়া। মিথ্যা সব কিছু। ওই শালার ভণ্ডটারে পাইলে এক্কেরে…’ কথা শেষ করল না ফকির । কিন্তু তার কণ্ঠের চেপে রাখা ক্রোধের তীব্রতায় চমকে উঠলাম আমরা।
আমরা বােঝানাের চেষ্টা করি তাকে, হয়তাে তােরই ভুল হয়েছে কোথাও। তুই মড়ার খুলি তুলে ফিরে আসার সময় পিছে তাকিয়েছিস একবারও?’ এত বড় দুঃসাহসিক সাধনা ব্যর্থ হওয়ার আশংকায় বিমূঢ় আমরা সাধকের বাতলানাে বহু শর্তের একটি মনে করিয়ে দিলাম তাকে।
না, একবারও না।’ দৃঢ় উত্তর তার।
‘কোনও দিক থেকে তাের নাম ধরে ডাক দিয়েছে কেউ?’
নাহ, সেরকম কিছু হয় নাই। আমি গেছি, একখান ভাঙা কবরে নামছি, মাথার খুলি নিয়া ফিরা আইছি সােজা বাড়িত। এর মইদ্যে আর কিছু হয় নাই। ওই ব্যাটা ভণ্ড যাযা কইছে তার মইদ্যে একখানও হয় নাই।’
ফকিরের এই দুঃসাহসিক অভিযানের অনেক আগে থেকেই আমার নিজেরও অসীম ক্ষমতাধর হওয়ার এই পদ্ধতিটা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল এবং আন্তরিক বিশ্বাসও ছিল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তা বাস্তবে রূপদানে সাহসী হয়ে উঠতে পারিনি কখনও। কাজেই আগ্রহটা আগ্রহই থেকে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ফকিরের জবানবন্দীতে পদ্ধতির পরিণতি শুনে ভীষণভাবে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়লাম আমি এবং সেই সাথে হতাশাও গ্রাস করল আমাকে।
এর পর ফকিরের নীরব মূর্তির মুখােমুখি হলাম আমরা। কবর অভিযানের পর এমনিতেই কথা-বার্তা অনেক কমে গিয়েছিল তার। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা প্রকাশ করার পর সে একেবারে নীরব হয়ে গেল। আমাদের প্রতিদিনের নির্ধারিত আডডায় তার আসাযাওয়াও কমে যেতে লাগল এবং অবশেষে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল ফকির। দু’চার দিন খোজ করলাম তার। কেউ বলতে পারল না সে কোথায় গিয়েছে। যতই দিন গেল ধীরে ধীরে তার ব্যাপারটা ভুলে যেতে লাগলাম আমরা। কিন্তু যেমনভাবে অদৃশ্য হয়েছিল তেমনি হঠাৎ একদিন এসে হাজির সে।
ছিন্নভিন্ন পােশাক-আশাকে ক্লান্ত-শ্রান্তউদ্ভ্রান্ত ফকিরকে দেখে আমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। প্রাণহীন মৃত মানুষের দৃষ্টি তার চোখে। মুখে বিড় বিড় করা ভাষা। কী বলে বােঝা যায় না। আমরা যারা তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলাম তারাও হতবাক হয়ে লক্ষ করলাম সে আমাদের কাউকে সহসা চিনতে পারছে না, অথবা না চেনার ভান করছে। মুখােমুখি হলে দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করে। নাম ধরে ডাকলে ভাষাহীন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপর নীরবে কেটে পড়ে সামনে থেকে। কবরে গিয়ে উল্টো-পাল্টা কাজ করে তার মাথায় যে কোন সমস্যা হয়েছে সে ব্যাপারে সন্দেহ রইল না আমাদের। তার জন্য সাইন্স-আর্টস্ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার কথা ভাবলাম আমরা। অনেক দিনের পুরনাে বন্ধুর জন্য মনের গহীনে একটা দায়বদ্ধতা ছিল আমাদের। কিন্তু তাকে কোনও এক জায়গায় পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ল। সারাক্ষণ সে উদভ্রান্তের মত চক্কর দিতে লাগল রাস্তায়রাস্তায়, ঝােপে-জঙ্গলে, নদীর তীরে। তবে বাজার এলাকা বা বেশি মানুষের সমাগম হয় এমন স্থানগুলাে সযত্নে এড়িয়ে চলতে লাগল সে। কাজেই তাকে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ল আমাদের জন্য।
এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন। যতই দিন যাচ্ছিল ফকিরের মধ্যে অস্বাভাবিকতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তার অস্বাভাবিক আচরণে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। সারাদিন সে কোথায় থাকে কী করে কিছুই জানে না তারা। গভীর রাতে বাড়ি ফেরে। ঘুমের ঘােরে মাঝে-মধ্যে হঠাৎ ভয়ঙ্করভাবে চিক্কার-চেঁচামেচি জুড়ে দেয়। তার খুব কাছের। বন্ধু হিসেবে আমি তার এই অবস্থাটা মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু তার জন্য কিছু করব সেই উপায়ও বের করতে পারছিলাম না। তাকে খুঁজে পাওয়াই ছিল মূল সমস্যা। সে কিছুতেই ধরা দিতে চাইছিল না। কিন্তু আমি নাছােড়বান্দার মত খোজ করতে লাগলাম তার। তবুও খুব একটা সুবিধে করতে পারছিলাম না।
অবশেষে একদিন পেলাম তাকে। সন্ধে পার হয়ে গিয়েছে তখন। আবহাওয়া পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছিল শরীরে। সেই ধাক্কায় শরীরটা টালমাটাল ছিল । স্বভাববিরুদ্ধভাবে অন্যদেরকে ফেলে রেখে আমীর আলী ছাত্রাবাসের পেছনের বড় মাঠের প্রতিদিনের আড্ডা থেকে উঠে এলাম তাড়াতাড়ি। বাজার পার হয়ে স্কুলের কোণে দেখা পেলাম ফকিরের। আজ এত কাছে পেয়ে সুযােগটা হারাতে চাইলাম না আমি। সে আমাকে দেখে দ্রুত পথ চলতে লাগল, যেন আমার কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। আমি প্রায় দৌড়ে ধরলাম তাকে।
‘ফকির, শুনে যা।’
সে থামল না। নীরবে দ্রুত পথ চলতে লাগল। আবার ডাক দিলাম তাকে।
‘ফকির!’
সে নীরব। এগিয়ে গিয়ে হাত ধরলাম তার। থেমে গেল সে। ভাষাহীন নিপ্রাণ দৃষ্টির অস্তিত্ব টের পেলাম আধাে অন্ধকারেও। আমি বললাম, ‘চল আমার সাথে। প্রায় টেনে নিয়ে চললাম তাকে।
‘কোথায়? মুখ খুলল সে।
‘পুকুর ঘাটে।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে পথ চলতে লাগলাম আমি । সে নিশ্চুপ রইল বাকি পথটুকু। কিছুক্ষণ পর ঘাটে এসে বসলাম আমরা।
‘তাের কী হয়েছে খুলে বল তাে আমাকে। আমার পক্ষে যতটুকু আন্তরিকতা প্রকাশ সম্ভব তার সবটুকুই গলায় ঢেলে প্রশ্ন করলাম তাকে। কিন্তু সে নিশ্চুপ । আমি ছাড়লাম না।
‘কোন অসুখ-বিসুখ হলে বল আমাকে।
আমি দেখছি কী করা যায়। তুই কোন চিন্তা করিস না।’ আশ্বাসের সুরে বললাম আমি। কিন্তু সে নিরুত্তর। তার নীরবতা ধৈর্যহীন করে তুলল আমাকে।
‘কী ব্যাপার, কিছু বল!’ প্রায় ধমকে উঠলাম আমি।
ধীরে ধীরে নড়ল সে। মুখ তুলে অন্ধকারে ছুড়ে দিল দৃষ্টি। তারপর বলল, “আমি শ্যাষ হইয়া গ্যাছি।
তার গলার হাহাকার আমার হৃদয়টায় একটা হ্যাচকা টান দিল। আমি ব্যাকুল হয়ে বললাম, কী হয়েছে তাের? সব খুলে বল আমাকে।’
‘না, সে কথা তুই সহ্য করবার পারবি না, আমি শ্যাষ হইয়া গ্যাছি।’
‘যত যাই হােক তুই বল আমাকে। যাই ঘটুক সেটা মনে পুষে রাখলে তাের যন্ত্রণা আরও বাড়বে। বরং তুই আমাকে জানালে তাের মনের ভার হয়তাে কিছুটা কমে যাবে।’ আমি তাকে বােঝানাের আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি।
হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল সে, নারে, আমার সব শ্যাষ। অখন আর মাইনষেরে শুনাইয়া কোন লাভ নাই।’
তার কণ্ঠ থেকে হতাশা যেন ঝরে ঝরে পড়তে লাগল। কিন্তু আমি বহু দিন পর এমন নিভৃত স্থানে ঘনিষ্ঠভাবে পেয়ে আর কিছুতেই সুযােগটা হাতছাড়া করতে চাইছিলাম না। মুখ যখন খুলেছে তখন অবশ্যই তার কাছ থেকে কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হবে-এমন আশা চেপে ধরল আমাকে। আমি কোমল কণ্ঠে বললাম, যা-ই হােক তাের, আমাকে শােনা। কিছু করতে পারলে করলাম। না হলে আর কী, চেষ্টা করতে তাে দোষ নাই। নাকি?”
তার জবান খুলে গেল। ফিসফিসে নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলে যেতে লাগল তার কথাগুলাে। যতই শুনতে লাগলাম স্তব্ধ হয়ে যেতে লাগলাম আমি। তার সেই কথাগুলাে জীবনে কখনােই ভুলতে পারব না আমি। তার সেই না ভুলতে পারা কথাগুলােই এত দিন পর শােনাব আমি নিজের ভাষায়।
ফকির বলতে লাগল, ‘মড়ার খুলি কবর | থেকে তুলে আনার পর আমি মনে করেছিলাম, এবার বিরাট কিছু হয়ে গেলাম। এই করব, সেই করব আরও কত কিছু! কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল, দেখলাম আসলে কিছুই না। কিছুই পাইনি আমি। তখনই তােদেরকে বলেছিলাম সব ভুয়া, সব মিথ্যে। বাজারের ওই ভণ্ডটার ওপর প্রচণ্ড রকম রাগ-ক্রোধক্ষোভ পাগল করে তুলল আমাকে। ক্রোধের তীব্রতা এমনই ছিল যে সেসময় হাতের কাছে পেলে কামড়ে খেয়ে ফেলতাম তাকে। যে লােক এসব গল্প বলে হাজার হাজার মানুষকে ধোকা দিয়ে তাবিজ-পানিপড়ার ব্যবসা করছে, তার মুখােশটা খুলে দিয়ে প্রকৃত চেহারা প্রকাশ করে তাকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য মনের মধ্যে ভয়ানক অস্থিরতা বােধ করতে লাগলাম আমি। তাকে খুঁজে বের করার জন্য ঘর ছাড়লাম শেষে। বাজার-ঘাটে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে লাগলাম। এভাবে এক সময় পকেটের পয়সা শেষ হয়ে এল। কাজ-কর্ম কিছু না করাতে খাবার-দাবারের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। এমনি সময় আকস্মিকভাবে অদ্ভুত একটা সমাধান বের হয়ে এল আমার সামনে।
মড়ার খুলি কবর থেকে তুলে আনার ফলে আর কিছু না পেলেও একটা জিনিস পেয়েছিলাম। কবরের ভয় বলতে কোন কিছু অবশিষ্ট ছিল না আমার অন্তরে। একটা পুরাে দিন না খেয়ে ছিলাম। হঠাৎ সামনে দিয়ে একটা লাশ কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় বুদ্ধি খুলে গেল আমার। রাত গভীর হতেই গােরস্থানে চলে গেলাম। তারপর কিছুক্ষণ পরিশ্রম করে কবরের ওপরের মাটি সরিয়ে বাঁশ-টাশ উল্টে ফেলে কবরে নেমে টান দিয়ে কাফনের কাপড় খুলে নিয়ে এলাম। সেই কাপড় বিক্রি করা টাকায় খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়ে গেল।
এভাবেই দিন চলতে লাগল আমার। প্রায়ই কোনও না কোনও জায়গায় কেউ না কেউ মারা যায়। আমি খবর পেলেই দেখে আসি কোথায় কবরটা দেয়া হচ্ছে। তারপর রাতেরবেলায় গিয়ে কাফনের কাপড় খুলে নিয়ে আসতে থাকি। কষ্ট করে কবরের মাটি আবার চাপা দিয়ে আসারও প্রয়ােজন মনে করতাম না ।
বাজারে বাজারে ঘুরতাম। কাফনের কাপড় বিক্রি করা টাকায় দিন বেশ চলে যাচ্ছিল। খাবার-দাবারের কোন চিন্তা নেই। মনের মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা নেশার মত পেয়ে বসেছিল, ওই ব্যাটা ভণ্ডটাকে ধরতে হবে। বাড়ি-ঘরের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
কিন্তু কিছু দিন পর নির্মম সত্যটা ধরা পড়ল আমার কাছে। ভণ্ডটাকে ধরার নেশার সাথে অন্য একটা নেশাও পেয়ে বসেছে আমাকে। সেটা হলাে গভীর রাতে কবরে গিয়ে কাফনের কাপড় খুলে আনা। আমি যখন ব্যাপারটা ধরতে পারলাম তখনই ফিরে আসার কথা ভেবেছিলাম । কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সারা দিন খারাপ লাগত। একটা পাপবােধ তাড়া করে ফিরত আমাকে। কিন্তু, যখনই কোনও জায়াগায় মৃত মানুষের খবর পেতাম তখনই আমার শরীর ভারী হয়ে আসত। একটা অস্থিরতা গ্রাস করত আমাকে। যতক্ষণ না কাফনের কাপড় খুলে আনতে পারতাম ততক্ষণ আর কিছুতেই অস্থিরতা কাটত না আমার। বাস্তবিকই নেশাটার হাতে পুরােপুরি বন্দী হয়ে পড়েছিলাম আমি ।
ধীরে ধীরে আমার স্বভাব পাল্টে যেতে লাগল। কদিন পর অনুভব করলাম কাজটার মধ্যে বেশ আনন্দ রয়েছে। রাত-বিরেতে নিকষ আঁধারে নির্জন কবরে গিয়ে সদ্য মৃত মানুষের শরীর থেকে কাফন খুলে আনার আনন্দ। মনের পাপবােধ নষ্ট হয়ে গেল। চিন্তাধারাও পাল্টে গেল। ভাবতে লাগলাম, লাশ তাে আজ হােক কাল হােক পচেই যাবে। খামােকা এত সুন্দর নতুন কাপড়টা নষ্ট করে লাভ কী? বরং সেটা আমারও কাজে লাগুক, আবার কিছু গরিব মানুষও সস্তায় কাপড় কিনে পরুক। তাতে তাে বরং মানুষেরই উপকার।
এভাবে ভালই দিন কেটে যাচ্ছিল। অন্য কোন কাজ করার দরকার হত না। সারা দিন ঘুরে ফিরে সময় কাটিয়ে দিতাম। যেখানে রাত হত সেখানেই কাত হয়ে শুয়ে পড়তাম। খাবার-দাবারের ভাবনা নেই। শুধু নতুন কোন মৃত্যু সংবাদ পেলেই ছুটে যেতাম সেখানে। তারপর গভীর রাতে আমার কাজ সেরে ফিরে আসতাম।
কিন্তু হঠাৎ একদিন সব ওলট-পালট হয়ে গেল। একটা অল্প বয়সী মেয়ে মারা যাওয়ার খবর পেলাম কীভাবে মারা গিয়েছে তাতে আমার কোনও মাথা ব্যথা ছিল না। আমার দরকার কাফনের কাপড়। আমি ছুটলাম তার কবরের খবর সংগ্রহ করার জন্য। খবর যােগাড় শেষে আমার আস্তানায় ফিরে এলাম আবার। দিন শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমার শরীর ভারী হয়ে আসতে লাগল। গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এক সময় রওনা হলাম আমি। তারপর নির্দিষ্ট কবরে গিয়ে কাজে ঝাপিয়ে পড়লাম। নরম মাটি সরাতে বেশি সময় লাগল না। বাঁশ সরানাের সময় হঠাৎ মনে হলাে কেমন যেন একটা গােঙানির আওয়াজ পেলাম । মনের ভুল মনে করে আবার কাজে লেগে পড়লাম। অল্প সময়ের মধ্যে বাঁশগুলাে সরিয়ে কবরে নেমে পড়লাম আমি। কাফনের কাপড়ে হাত দিতেই আবার শুনতে পেলাম শব্দটা। এদিক-সেদিক তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না। তবে মনের মধ্যে একটা অস্বস্তিবােধ হতে লাগল। কিন্তু তখন অত ভাবার সময় নেই। দ্রুত কাফন খুলে ফেললাম আমি। এমনি সময় হঠাৎ চাদটা মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে এল। চাঁদের আলােয় ঝকঝক করে উঠল চারদিক। সেই আলােয় দেখলাম অপরূপ সুন্দরী একটা মেয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে আমার সামনে। মেয়েটাকে দেখে কিছুতেই মৃত বলে মনে হলাে না। যেন জীবন্ত একটা সদ্য যুবতী মেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে মাটির ওপর। হঠাৎ মনের মধ্যে কুমন্ত্রণা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল আমার। নিজেকে সংযত করতে পরলাম না আমি। বুকে হাত দিলাম মেয়েটার। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা মানুষের শরীর। অসৎ কামনা প্রবলভাবে বশ করে ফেলল আমাকে। আমি তার শরীরে হাত বুলাতে লাগলাম। এ সময় আমি স্পষ্ট মেয়েটার শরীরের কাপন অনুভব করলাম। তার শরীরের কাপন আমর হাতের মধ্য দিয়ে আমার শরীরে প্রবেশ করল। ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠলাম আমি। এত দিনে এই প্রথম ভয় পেলাম আমি। আর ঘাঁটাঘাঁটি না করে কাফনের কাপড় নিয়ে উঠে পড়লাম কবর থেকে। কবরটা থেকে মাত্র কয়েক ধাপ এগিয়েছি এ সময় একটা জোরালাে শব্দে পিছু ফিরতে বাধ্য হলাম আমি। আমার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেঁপে উঠল। কবরের পাশে উঠে বসেছে মেয়েটা। সারা শরীরে একটা সুতাে নেই। চাঁদের আলােয় ঝকঝক করে যেন আলাে বের হচ্ছে তার শরীর থেকে। কিন্তু চোখের জায়গা দুটোতে চোখের কোনও অস্তিত্ব নেই। সেখান থেকে টকটকে লাল আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করে বেরিয়ে আসছে। সেই দৃশ্য আমার সমস্ত সত্তা গ্রাস করল। ভয়ের অনুভূতি কী কখনও সত্যিকারভাবে বুঝিনি। কিন্তু সে মুহূর্তে এত ভয় কোথেকে আমার সমস্ত অস্তিত্বে এসে বাসা বাঁধল আমি নিজেও বুঝতে পারলাম না। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল আমার। মেয়েটা পরিস্কার গলায় বলে উঠল, তুই এই কবরবাসীদের সামনে আমাকে যেভাবে বেইজ্জত করলি, তােকেও আল্লাহপাক সেভাবে বেইজ্জত করবে।’
কাফনের কাপড় ফেলে দৌড় দিলাম আমি। কতক্ষণ দৌড়েছি জানি না। এক সময় খােলা একটা জায়গায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম। কতক্ষণ এভাবে পড়েছিলাম তা-ও জানি না। চোখ খােলার পর দেখলাম দিনের আলাে চারদিকে। কিছু মানুষ ভিড় করে দেখছে আমাকে। ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। মানুষজন ধরাধরি করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। কিছু দিনের মধ্যে সুস্থ হলাম ঠিকই, কিন্তু আমার জীবনের সমস্ত শান্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। মেয়েটার সেই কথাগুলাে অনবরত কানে বেজে চলেছে আমার। প্রতিটি মুহূর্ত মেয়েটার ভয়ানক চোখ দু’টো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে।
তার কথা শুনতে শুনতে কখন যে আমি ঘােরের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম নিজেই জানি । পরে যখন ঘাের ভাঙল ফকিরকে দেখলাম সামনে। অনেক রাত হয়েছিল। ঘােরের মধ্যে কোন রকমে নিজেকে হিচড়ে নিয়ে এলাম বাসায়। বিছানায় পড়ে গেলাম কয়েক দিনের জন্য।
আমার সাথেই সম্ভবত ফকির শেষ কথা বলেছিল। এরপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। বহুদিন পর শুনেছিলাম সে মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ায়। তার কথাগুলাে আমাকে জানিয়ে তার মনের ভার কিছুমাত্র লাঘব হয়েছিল কি না, কিংবা প্রতিটি মুহূর্ত বয়ে বেড়ানাে ভয়ানক অবস্থা থেকে বিন্দুমাত্র মুক্তি মিলেছিল কি না জানি না। তবে আমার মনের ওপর দুঃসহ বােঝার মত চেপে বসা তার কথাগুলাে অনেক দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয়েছে আমাকে। সেই বােঝাটা আমার নিজের জন্য নয়, ফকিরেরই জন্য।
-হাসানুজ্জামান মেহেদী
