• অনুবাদ গল্প
  • গল্প
  • মরুভূমির অশ্রু

    আমার এক বন্ধু মরক্কো থেকে ফিরে একটি সুন্দর গল্প শুনাল, গল্পটি একজন ধর্মপ্রচারক এবং একজন অদ্ভুত মানুষকে নিয়ে। একজন ধর্মপ্রচারক মরক্কোর মারাকাশে পৌছে সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রতিদিন তিনি শহরের অদূরে মরুভূমিতে হাঁটতে যাবেন। প্রথম যেদিন তিনি মরুভূমিতে গেলেন দেখতে পেলেন একটি লােক মাটিতে কান চেপে শুয়ে আছে আর তার একটি হাত দিয়ে মাটিতে আঘাত করছে।

         ‘লােকটা নিশ্চয়ই পাগল, ধর্মপ্রচারক নিজেকে বললেন। কিন্তু প্রতিদিন এই দৃশ্য বার বার দেখতে লাগলেন এবং এক মাস পার হয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলেন এই রহস্যের উদঘাটন করবেন। তিনি সরাসরি লােকটির সাথে কথা বলবেন, কিন্তু সমস্যা হলাে এখনও তিনি আরবীতে পারদর্শী হতে পারেননি। তবুও তিনি লােকটির কাছে গেলেন, তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করছেন?

         লােকটি বলল, মরুভূমিকে সঙ্গ দিচ্ছি তার একাকীত্বে, এবং কাঁদছে বলে সান্ত্বনা দিচ্ছি।’

         ‘আমি তাে জানতাম না যে মরুভূমি কাঁদতে জানে।’

         ‘সে প্রতিদিন কাঁদে, এই কান্না শুধু মানুষকে সহায়তার জন্য। সে চাচ্ছে তার এই ধূসর মরুভূমি বিশাল বাগানে পরিবর্তিত হয়ে যাক, যেন মানুষরা তাদের খাদ্যশস্য ফলাতে পারে, ফুল ফোটাতে পারে এবং মেষগুলাে এই বাগানে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে।’

         ‘ঠিক আছে, আপনি মরুভূমিকে বলেন সে এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যখন আমি মরুভূমিতে বেড়াতে আসি, তখন বুঝতে পারি মানুষের আসল আকৃতি, তার এই বিশাল প্রান্তর আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়,

         সৃষ্টিকর্তার তুলনায় আমরা আসলে কত ক্ষুদ্র। যখন আমি তার ধু-ধু বালির দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি এই লক্ষ লক্ষ জন্ম নেওয়া মানুষরা সবাই সমান, যদিও জানি সবার নিয়তি এক রকম হয় না। তার পর্বতগুলাে আমাকে আত্মমগ্ন হতে সহায়তা করে, আর যখন দিগন্ত রেখায় সূর্যকে উঠতে দেখি তখন আমি সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অনুভব করি।’

         ধর্মপ্রচারক তাঁর দৈনন্দিন কজে ফিরে গেলেন, এর পরের দিন, লােকটিকে ওই জায়গায় ওই অবস্থায় দেখে তিনি হতভম্ব!

         ‘আপনি কী আমার সেইসব কথাগুলাে মরুভূমিকে বলেননি?

         লােকটি মাথা নাড়ল। 

         ‘সে কি এখনও কাঁদছে?’

         ‘আমি তার দীর্ঘ নিশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। সে এখনও কাদছে, সে হাজার হাজার বছর

    কাটিয়ে দিল এই ভেবে যে সে কোন কাজে আসেনি আর সে তার সময় নষ্ট করেছে

    সৃষ্টিকর্তার নিন্দা করে। ‘ঠিক আছে, মরুভূমিকে বলেন, আমরা মানুষরা খুব ছােট্ট একটা জীবন চক্রে আবদ্ধ, আমাদের এই জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটছে এই ভেবে যে, আমরা কোন কাজে আসিনি। আমরা নিয়তিকে খুব অল্প পরিমাণ জানতে পেরেছি এবং অনুভব করি সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রতি সবসময় সহায় না। যখন জীবনের শেষ মুহূর্তটি আসে, তখন আমাদের কাছে এমন কিছু প্রকাশিত হয় যার জন্য এই পৃথিবীতে আমাদের আবির্ভাব। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে, এই জীবনের জন্য কিছু করার থাকে না। ঠিক এই মরুভূমির মত হাহাকারে কাতরাতে থাকি, নিজেদেরকে দোষারােপ করি জীবনের মূল্যবান সময়গুলাে নষ্ট করার জন্য।’

         লােকটি বলল, জানি না মরুভূমি আপনার কথাগুলাে শুনবে কিনা। যন্ত্রণা তার নিত্যসঙ্গী, অন্যভাবে কোনকিছু দেখতে পারছে না ।

         ‘আসুন, আমরা ওর জন্যে প্রার্থনা করি, যা আমরা সবসময় করি মানুষের দুঃসময়ে।’

         তারা বসে প্রার্থনা শুরু করল। একজন বসল মক্কাকে সামনে রেখে কারণ সে মুসলিম এবং অন্যজন দু’হাত একত্রে কারণ তিনি ক্যাথলিক। তারা নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করল, যিনি সব সময় সবার কাছে সমান। ওঁকে, মানুষরা যতই ভিন্ন নামে ডাকুক না কেন-তিনি তাে শুধু একজন।

         ওই দিনের পর থেকে ধর্মপ্রচারক ওই লােকটিকে আর দেখেননি তবে ওই জায়গাটিতে যেখানে সে শুয়ে থাকত, সেটি ভেজা ভেজা লাগল। ওই জায়গা থেকে ঝর্নার মত বুদ্বুদ আকারে পানি বের হতে লাগল। এর মাসখানেকের মধ্যে পানির ঝর্নাটি আকারে বৃদ্ধি পেল, শহরবাসীরা ওই ঝর্নাটিতে কুয়া তৈরি করল।

         বেদুঈনরা কুয়াটির নাম দিয়েছে মরুভূমির অশ্রু কুয়া। তারা বলে, কেউ যদি এই কুয়ার পানি পান করে, তা হলে তার দুঃখগুলাে আনন্দে পরিণত হবে এবং শেষ পর্যন্ত সে তার সত্যিকারের নিয়তির খোজ পাবে।

    মূল: পাওলাে কোয়েলহাে

    রূপান্তর: সামশেদ সায়েম রানা

    Spread the love

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    1 mins