এক

মাস কয়েক আগের কথা- এলাকায় কান পাতা দায়। জামাল ফকিরের গুণকীর্তনের যন্ত্রণায়। যেখানেই যাই, সবার মুখে শুধু জামাল ফকিরের নাম। সে এই করেছে, সে তাই করেছে। শুধু জামাল ফকির আর জামাল ফকির। মন্ত্রতন্ত্র, তুকতাক এইসব বুজরুকিতে আমার কোন কালেই কোন বিশ্বাস নেই। বরং এসব শুনলে মেজাজ খারাপ হয়। তাই যথাসম্ভব চেষ্টা করতে লাগলাম জামাল ফকিরকে এড়িয়ে চলবার। মানে যেখানে তার বিষয়ে কথাবার্তা, সেখানেই আমি নেই।

     দিন ভালই কাটছিল। ছােটবেলা থেকেই কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ার খুব নেশা আমার । একজন মানুষের হাতে কী জাদু থাকলে তার পক্ষে লেখক হওয়া সম্ভব-এই তদন্তে নেমে নিজেও কয়েকটা কবিতা, গল্প লিখে ফেললাম। শুধু লিখেই থামলাম না। সেগুলাে প্রকাশের আশায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পাঠাতেও শুরু করলাম । দুয়েকটা করে ছাপাও হতে লাগল ।

     বন্ধু মহল সব সময় আমার প্রতিভা নিয়ে সন্দেহে ভােগে। তাদের ধারণা হলাে লেখাগুলাে আসলে অন্য কারও। আমি শুধু লেখকের সাথে নিজের নামের মিল থাকবার ফায়দা লুটছি। তাদের সন্দেহের মূলে ঈর্ষা। কারণ বন্ধুমহলে যেমনই হােক, লেখক হবার সুবাদে বান্ধবীমহলে আমার খাতির একটু বাড়ল। আসলে যুগ যতই আধুনিক হােক না কেন, লেখকদের প্রতি দুর্বল সুন্দরীর দেখা আজও পাওয়া যায় বৈকি।

     বন্ধুদের সন্দেহ দূর করা এবং বান্ধবীদের কাছে আমার লেখক পরিচয় আরও দৃঢ় করবার ব্যবস্থা নিলাম। এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠাবার সময় লেখার নীচে আমার ঠিকানা বা মােবাইল নম্বর ছাপার অনুরােধ জানালাম সম্পাদক সাহেবদের কাছে। একজন অনুরােধ রাখলেন। আমার ঠিকানা ও নম্বর ছেপে দিলেন লেখার সাথে। বন্ধু ও বান্ধবী মহলে বুক ফুলিয়ে দেখালাম সে সংখ্যাটি।

কিন্তু সমস্যা হলাে অন্য জায়গায়। প্রচুর মিসডকলে আমার রাতের ঘুম প্রায় হারাম হয়ে গেল। কল যে দু-একটা পেতাম না তেমন নয়। তবে তা মিসডকলের তুলনায় নিতান্তই কম।

     বন্ধুদের কাছে লেখক পরিচয় প্রমাণ করা গেছে। মিউকলের হাত থেকে বাঁচবার জন্য যখন নম্বর পাল্টাবার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছি, তখন এক অপূর্ব কণ্ঠের অধিকারিণীর ফোন পেলাম। তিনি নিজেকে একটি লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদিকা পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন তাঁদের পত্রিকার জন্য একটি গল্প পাঠানাে আমার পক্ষে সম্ভব কি না?

     কণ্ঠস্বরে দ্রবীভূত আমার তাঁর মতে মত দিতে সময় লাগল না। কিছুদিনের মধ্যেই এক বড় গল্প তার দেয়া ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম ।

     মাসখানেক অপেক্ষার পরও তারা যখন আমাকে কিছু জানাল না, তখন ধরে নিলাম লেখাটি হয়তাে মনােনীত হয়নি। কী একটা কাজে কিছুদিন পর জেলা শহরে গিয়েছিলাম। ফিরবার সময় স্বভাব মত একটা বইয়ের দোকানে ঢু মারলাম। পছন্দানুযায়ী বই বাছাইয়ের সময় হঠাৎ চোখ পড়ল ওই সম্পাদিকার বলা নামের লিটল ম্যাগাজিনের উপর। বেশ ঝকঝকে প্রচ্ছদ। কয়েকটি বইয়ের সাথে কিনে ফেললাম ওর এক কপি ।

     বাড়ি ফিরে সদ্য বইগুলাে ঘেঁটে দেখে লিটল ম্যাগাজিনটি হাতে তুলতে দিন সাতেক দেরি হলাে। অবশ্য প্রথমেই একবার সূচীপত্রে দেখেছি আমার নাম নেই। পত্রিকাটির বিভিন্ন লেখা পড়তে লাগলাম। আমার গল্প না ছাপানাের কারণে সম্পাদিকার উপর রাগ ছিল। তাই তার গল্পটি পড়া শুরু করলাম সবার শেষে।

গল্পটা একটু পড়েই চমকে যাই। আমার গল্প । মানে ওদের কাছে পাঠানাে আমার গল্প । গল্প, চরিত্রগুলাে এবং লেখকের নাম বদলে বাকি সব ঠিক রেখেছে। পড়া শেষে হতভম্ব হয়ে গেলাম। ধাতস্ত হয়েই ফোন করলাম পত্রিকায় যােগাযােগের জন্যে দেয়া নম্বরটিতে। ফোন ধরলেন সম্পাদিকা নিজেই। আমার নাম পরিচয় দিয়ে ঘটনা তাঁকে বললাম। উনি সব নির্লজ্জভাবে স্বীকার করে জানালেন এ বিষয়ে কী আমার এখন কিছুই করার নেই। কথাটা জানিয়েই ফোন রেখে দিলেন। ভেবে দেখলাম কথাট সত্যি। আমার মত ছােট লেখকদের লেখার কোন প্রমাণ থাকে না। কোনভাবেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না। নিজের অক্ষমতা আক্রোশে আমাকে পাগল করে তুলল।

দুই

নদীর দু’পাশের দৃশ্য অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু এসব লক্ষ করবার মতন মনের অবস্থা নেই। মাথায় গত কয়েকদিন খালি একটি বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রতিশোেধ। হঁ্যা, প্রতিশােধ নিতে হবে। সুন্দর কণ্ঠের অসুন্দর মেয়েটার প্রতি প্রতিশােধ। আমার না কী করবার কিছু নেই! বেশ তাে দেখা যাক করবার কিছু আছে কি না। আইন হয়তাে নেই। কিন্তু জামাল ফকির! সে তাে আছে। জামাল ফকির কোন আইন মানে না।

     আসলে এসব তুকতাক, জাদুটোনায় বিশ্বাস আমার কোন কালেই ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু ওই যে কথায় আছে-‘ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে।’ আইন অনুযায়ী ওই ডাইনিটার কিছু করা যাবে না। তাই এই ব্যবস্থা।

     জামাল ফকিরের ঠিকানা জোগাড় করতে বিস্তর ঝামেলা করতে হয়েছে। তাকে না কী কোন এক ঘটনার পর সক্রিয় অবস্থায় আর দেখা যায় না। আগে যেখানে তার ডেরা ছিল সেটাও না কী পাল্টেছে। কিন্তু এত কিছু যে ঘটনার জন্য সেটাই কেউ আমাকে বলতে পারল না। আমারও এত সবের দরকার নেই। আমার দরকার প্রতিশোেধ। জামাল ফকির সেটার ব্যবস্থা করলেই হবে।

     নদী পার হয়ে সংগ্রহ করা ঠিকানায় যখন পৌছলাম তখন বিকাল। চারদিকে বাঁশঝাড় আর ছােট বড় ঝােপ মিলিয়ে জায়গাটাকে অনায়াসে বন বলা চলে। সেই বাঁশবনের মাঝ দিয়ে একটা পায়ে চলা পথ এগিয়েছে। সে পথ ধরে সামনে এগােলাম। গরমের দিন, বিকাল। সূর্য মামা যথেষ্ট তেজী। কিন্তু এই বনের মধ্যে গরমের ছিটেফোঁটাও নেই। ছায়াময় শীতল পরিবেশ।

     বেশ কিছুদূর যাবার পর একটু ফাকা জায়গা পেলাম। জায়গাটা ঠিক পুরাে ফাঁকা নয়। একটা খড়ের ছাউনি আছে তার একধারে। বুঝলাম বাকিটুকু উঠান। উঠানের একপাশে একটি মাটির চুলা। ছাউনিতে কেউ আছে কী না বােঝার জন্য গলা খাকারি দিলাম । যে শব্দটুকু হলাে তাতে ছাউনির ভেতর থেকে একটা হুলাে বিড়াল বের হয়ে এসে বার দু’এক হাই তুলে আমাকে ঘিরে অলসভাবে চক্কর দিতে লাগল।

     কিছু পরে যে লােকটি ছাউনি থেকে বেরিয়ে এল, তাকে দেখলে চলন্ত পাটকাঠি ছাড়া কিছু মনে হয় না। অতিশয় শীর্ণ। তার শরীরের হাড়গুলাে যেন মােটা পলিথিন সদৃশ চামড়া দিয়ে মােড়া। মাথা আর গাল যেন ঘন কাশবন। একটু কাছে আসতে লক্ষ করলাম মলিন লুঙ্গি পরা খালি গায়ের এই লােকটির চোখ দুটি অদ্ভুত। খুবই অদ্ভুত। একটি চোখের মণি ঘন কালাে। সে চোখে তীক্ষ দৃষ্টি। অপর চোখটি ঘােলা, দৃষ্টিহীন।

     উনিই জামাল ফকির কী না জেনে, জানালাম আমি একটি সমস্যা নিয়ে এসেছি। উনি কোন কথা না বলে ছাউনির ভেতর চলে গেলেন। একটু পরই বের হয়ে এলেন একটি পিড়ি নিয়ে। পিড়িটা উঠানে রেখে বললেন, বসেন, বাজান। বইসে বলেন কী সমস্যা।’

     বসলাম পিড়িতে। উনি আমার সামনে মাটিতে বসলেন। আমি ঘটনাটা খুলে বললাম। আরও বললাম কী চাই ওঁর কাছে। কোন কথা না বলে পুরােটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন জামাল ফকির। সব শুনে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে চক্কর দিতে দিতে বললেন, সহজ, বাজান। যা চাচ্ছেন তা খুবই সহজ। হাত-পাও সব অকেজো কইরে দিতি হবে তাে। কোন ব্যাপার না। অমাবস্যার রাত্তিরি একটা ডিম না পাড়া কুচকুইচা কালা মুরগি হলিই তা করা যাবে।’ চক্কর কাটা বন্ধ করে হঠাৎ আমার পেছনে দাঁড়ালেন উনি। একটা হাত আমার মাথায় রেখে বললেন, বাজান, এটু নজর কইরে দ্যাখেন তাে।’

     ওঁর কথা শেষ হবার সাথে সাথে আমার শরীর অবশ হয়ে এল। চোখের চারপাশে কেমন জানি একটা ধোয়ার পর্দা নামতে শুরু করল । আমি নিজেকে মুক্ত করবার জন্য শরীর ঝাড়া দিতেই পর্দাটা সরে গেল। সব কিছু পরিষ্কার হয়ে উঠল আবার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়-আমি আর জামাল ফকিরের উঠানে নেই। একটা সুদৃশ্য বেডরুমের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বেডরুমের মধ্যে বিছানায় এক মধ্য বয়স্কা রমণী অসহায় মুখে শুয়ে আছেন। তাঁর পুরাে শরীর একটা কালাে চাদর দিয়ে ঢাকা। পুতুলের মত দেখতে একটা তিনচার বছর বয়সী বাচ্চা মেয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আম্মু-আম্মু বলে কাদছে।

     পরিষ্কার বুঝতে পারলাম বিছানায় শােয়া রমণী সেই সুকণ্ঠী সম্পাদিকা। বাচ্চাটা তার মেয়ে। আমার নেয়া প্রতিশােধের ফলে এই পরিস্থিতি। ব্যাপার বুঝে আমি হাসতে শুরু করলাম । বাচ্চাটা যত জোরে কাঁদে, আমি তত জোরে হাসি। হাসির দমকে চোখে পানি আসায় আবার সব কিছু ঝাপসা হয়ে গেল। এবার ঝাপসা ভাব কাটতে বুঝতে পারলাম আমি আবার জামাল ফকিরের উঠানে চলে এসেছি, এবং আমার চোখে সত্যি পানি। তবে এ অঞ আনন্দের নয়, কষ্টের। জামাল ফকির আমার পেছনে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলে চলেছেন, প্রতিশােধ নিতি হয় না, বাজান। এই প্রতিশােধের নিশায় আমার একটা চোখ গেল। তাই অখন আমার একটাই মন্ত্র। প্রতিশােধ নিতি হয় না, বাজান। প্রতিশােধ নিতি হয় না।

– সবুজ ওয়াহিদ

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 mins